কয়েকদিন আগে কালের কণ্ঠ সহ একাধিক পত্রিকায় খবর বেরিয়েছে — এনবিআর তিন কোটি খুচরা দোকানকে কর জালের আওতায় আনতে চাইছে। প্রতি ১,০০০ টাকার পণ্যে ২ টাকা কর — অর্থাৎ ০.২%। দাবি করা হচ্ছে এটা "ভারতের মডেল"। কিন্তু প্রশ্ন হলো — এটা কি সত্যিই ভারতের মডেল? আর বাংলাদেশ কি আদৌ এর জন্য প্রস্তুত?
এই বিশ্লেষণে আমরা চারটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজব — ভারত কীভাবে এই সিস্টেম চালু করেছে, কোন প্রযুক্তিগত অবকাঠামো প্রয়োজন, বাংলাদেশ কতটা প্রস্তুত, এবং এর অর্থনৈতিক প্রভাব কী হবে।
ভারত ২০১৭ সালের ১ জুলাই GST (Goods and Services Tax) চালু করে — যা কেন্দ্রীয় ও রাজ্যের বিভিন্ন পরোক্ষ করের পরিবর্তে একটি একক কর ব্যবস্থা তৈরি করে। এরপর ২০১৮ সালের ১ অক্টোবর থেকে কার্যকর হয় TCS — Tax Collected at Source।
ভারত TCS চালু করার আগে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো তৈরি করেছিল:
১. GSTIN — ইউনিভার্সাল ব্যবসায়িক রেজিস্ট্রেশন: প্রতিটি ব্যবসায়ীর জন্য ১৫ সংখ্যার একটি অনন্য পরিচয় নম্বর, যা PAN-এর সাথে যুক্ত। ২০১৭ সালে ৬৫ লাখ থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ১.৫১ কোটিরও বেশি সক্রিয় নিবন্ধন।
২. e-Invoicing এবং IRP (Invoice Registration Portal): ২০২০ সাল থেকে পর্যায়ক্রমে চালু। প্রতিটি B2B ইনভয়েসে QR কোড এবং ডিজিটাল স্বাক্ষর — IRP-তে যাচাই ছাড়া ইনভয়েস আইনগতভাবে অবৈধ।
৩. UPI — Unified Payments Interface: ২০১৬ সালে চালু। ২০২৩ সালে বিশ্বের মোট রিয়েল-টাইম লেনদেনের ৪৯% হয়েছে শুধু ভারতে। ছোট দোকানদার থেকে শুরু করে সবার হাতে ডিজিটাল পেমেন্টের সুবিধা।
"ভারত প্রথমে অবকাঠামো তৈরি করেছে, তারপর কর আরোপ করেছে। এটাই সাফল্যের মূল রহস্য।"
— ভারতের GST বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা থেকেভারতেও প্রাথমিকভাবে ব্যাপক বিরোধিতা হয়েছিল — সুরাটের বস্ত্র ব্যবসায়ীরা ২০ দিন ধর্মঘট করেছিল, GSTN পোর্টাল বারবার বিকল হয়েছিল। কিন্তু ভারত সরকার বারবার হার কমিয়ে, রিটার্ন সহজ করে এবং ধীরে ধীরে বাস্তবায়ন করে সফল হয়েছে।
এই ধরনের রিটেইল ট্যাক্স ব্যবস্থা কার্যকরভাবে চালু করতে কমপক্ষে ছয়টি অবকাঠামো প্রয়োজন:
| অবকাঠামো | ভারতে কী আছে | বাংলাদেশে কী আছে |
|---|---|---|
| ডিজিটাল পেমেন্ট রেল | UPI — বিশ্বের #১ | bKash/Nagad — শক্তিশালী কিন্তু ইন্টারঅপারেবিলিটি দুর্বল |
| ব্যবসায়িক রেজিস্ট্রি | GSTIN — ১.৫১ কোটি নিবন্ধন | e-BIN — মাত্র ~৫.৫ লাখ সক্রিয় ফাইলার |
| e-Invoicing সিস্টেম | IRP — QR কোড সহ ইনভয়েস | EFD মেশিন — ৩ লাখের লক্ষ্যে মাত্র ১১,০০০ বসেছে |
| ট্যাক্স সফটওয়্যার | GSTN — উন্নত ম্যাচিং সিস্টেম | eVAT — উন্নতি হচ্ছে কিন্তু সীমিত |
| রিফান্ড মেকানিজম | দ্রুত ক্রেডিট সিস্টেম | TIN ছাড়া রিফান্ড নেই |
| ইন্টারনেট সংযোগ | উন্নত | গ্রামীণ এলাকায় মাত্র ২৬% স্মার্টফোন ব্যবহারকারী |
বাংলাদেশ মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসে বিশ্বে শীর্ষ স্থানীয়। bKash-এর ৬.৮ কোটি ব্যবহারকারী, সামগ্রিক MFS ইন্দ্রাস্ট্রিতে ২০০ কোটিরও বেশি নিবন্ধিত অ্যাকাউন্ট। ২০২৪ সালে দৈনিক গড় MFS লেনদেন ছিল ৪,৮৩৩ কোটি টাকা।
Binimoy ইন্টারঅপারেবিলিটি প্ল্যাটফর্ম ২০২২ সালে চালু হয়েও ব্যর্থ হয়েছে। প্রকৃত MFS ইন্টারঅপারেবিলিটি শুধুমাত্র ২০২৫ সালের শেষ দিকে NPSB-এর মাধ্যমে শুরু হয়েছে।
"পাকিস্তানের ডেপুটি প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন তাদের Tax-to-GDP ratio ১২%-এরও বেশি, আর আমাদের ৬.৬%-এ নেমে এসেছে — যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।"
— এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান, CPD সংলাপ, আগস্ট ২০২৫কর্পোরেট ডিস্ট্রিবিউটর/ডিলাররা রিটেইলারদের কাছে পণ্য সরবরাহের সময় ০.২% কাটবে এবং A-Challan সিস্টেম ও মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে জমা দেবে। রিটেইলারদের ট্র্যাক করা হবে মোবাইল নম্বর দিয়ে এবং প্রতি তিন মাসে SMS পাঠানো হবে। প্রথম পর্যায়ের লক্ষ্য ৫০ লাখ রিটেইলার।
৬,০০০ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রা শুনতে বড় মনে হলেও এটা এনবিআরের মোট রাজস্বের মাত্র ২%-এরও কম। পাইকারি ও খুচরা বাণিজ্য বাংলাদেশের GDP-র প্রায় ১৪%।
"একবার টাকা NBR-এ গেলে সেটা ফেরত আসে না। এ কারণেই এটা খরচ হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং পণ্যের মূল্যে যোগ করা হয়।"
— মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বাবু, সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনএই পদক্ষেপ অনানুষ্ঠানিক লেনদেন আনুষ্ঠানিক করতে সাহায্য করতে পারে, লুকানো আয় উন্মোচন করতে পারে এবং VAT ডেটা উন্নত করতে পারে। ভারতের মতো আনুষ্ঠানিক অর্থনীতি দ্বিগুণ হওয়া সম্ভব — তবে তার জন্য আগে অবকাঠামো চাই।
EasyTax Consultancy-তে CA Professional Level পরামর্শদাতা আপনার পাশে আছেন। বিনামূল্যে আয়কর ক্যালকুলেটর ব্যবহার করুন অথবা সরাসরি যোগাযোগ করুন।